দেওয়ানী মামলার আপীল Appeal কি? আপিল দায়েরের পদ্ধতি কি

0
আপীল কি?
কে আপীল দায়ের করতে পারে?
আপীল দায়ের এবং দায়েরের সময় কতদিন? 
কোন কোন ক্ষেত্রে আপীল করা যায়?
মূল বা আদি ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল সংক্রান্ত বিধান কি কি?
কোন কোন ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যায় না?
কিভাবে দেওয়ানি আদালতে আপীল দায়ের করতে হয়?
আপিলে কোন কোন কারণসমূহ গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
আপীলের আকার [Form of Appeal] কি?
কখন আদালত আপিলের স্মারকলিপি প্রত্যাখ্যান করতে পারে?
কখন আদালত ডিক্রি কার্যকরণ স্থগিত করতে পারে?

আপীল কি?

আপীল হলো উচ্চ আদালত কর্তৃক নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তের বিচারিক পর্যালোচনা। আপীল হলো সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তি কর্তৃক আপীল আদালতে দাখিলকৃত কোন আবেদন যেখানে আপীলকারী নিম্ন আদালতের কোন সিদ্ধান্ত বাতিল, পরিবর্তন বা সংশোধন করার আবেদন করে।

কে আপীল দায়ের করতে পারে?

কে আপীল দায়ের করতে পারে, তা দেওয়ানী কার্যবিধির ৯৬ ধারায় কিছু বলা হয়নি। তবে বিচারিক নজির অনুযায়ী নিম্নলিখিত ব্যক্তিগণ আপীল দায়ের করতে পারে।

১. মোকদ্দমার সংশ্লিষ্ট পক্ষ বা বৈধ প্রতিনিধি যে আদালতের ডিক্রি দ্বারা সংক্ষুদ্ধ।

২. মোকদ্দমার বিষয়বস্তুতে যার স্বার্থ রয়েছে।

৩. আদালতের রায় বা ডিক্রি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত গ্রহীতা

আপীল দায়ের এবং দায়েরের সময়সীমা কতদিন?

ডিক্রি বা আদেশ প্রদানকারী আদালত যদি সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ এবং যুগ্ম জেলা জজ এবং মোকদ্দমার মূল্যবান যদি ৫ কোটি বা ৫ কোটি টাকার নিম্নে হয় তাহলে আপীল করতে হবে ডিক্রি বা আদেশের তারিখ হতে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা জজ আদালতে। তামাদি আইন ১৯০৮ এর ১৫২ অনুচ্ছেদ। আর যদি ডিক্রি বা আদেশ প্রদানকারী আদালত যুগ্ম জেলা জজ (৫ কোটি টাকার অধিক মোকদ্দমার ক্ষেত্রে), অতিরিক্ত জেলা জজ এবং জেলা জজ হয় তাহলে আপিল করতে হবে ডিক্রি বা আদেশের তারিখ হতে ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে। তামাদি আইন ১৯০৮ এর ১৫৬ অনুচ্ছেদ। Section 21 (2) of the Civil Courts (Amendment) Act 2021.

কোন কোন ক্ষেত্রে আপীল করা যায়?

১. মূল বা আদি ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যায়। [ধারা ৯৬-৯৯ এবং আদেশ ৪১]

২. আদেশের বিরুদ্ধে আপীল করা যায়। (ধারা ১০৪-১০৬ এবং আদেশ ৪৩]

মূল বা আদি ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল সংক্রান্ত বিধান কি কি?

দেওয়ানী কার্যবিধির ৯৬ ধারায় এবং ৪১ আদেশে মূল ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

মূল ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল:

দেওয়ানী কার্যবিধির ৯৬ ধারায় বলা হয়েছে,

১. আদি এখতিয়ার প্রয়োগকারী আদালত কর্তৃক প্রদত্ত প্রত্যেক ডিক্রি হতে আপীল শ্রবণের ক্ষমতা সম্পন্ন আদালতে আপীল দায়ের করতে হবে।

২. একতরফা মূল ডিক্রি হতেও আপীল দায়ের করা যায়।

৩. পক্ষগণের সম্মতিতে আদালত কোন ডিক্রি প্রদান করে থাকলে তা হতে কোন আপীল চলবে না।

সুতরাং আইনে অন্য কিছু বলা না থাকলে, প্রত্যেক ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যায়। আদালতের কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীল করবেন কিনা তা নির্ধারণ করতে দেখতে হবে-

১. সিদ্ধান্তটি ডিক্রি কিনা। যদি ডিক্রি হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে বলে ধরে নিতে হবে।

২. ডিক্রিটি কোন আদালত দিয়েছে। যদি ডিক্রিটি আদি এখতিয়ার প্রয়োগকারী আদালত বা বিচারিক আদালত যেমন সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী বা যুগ্ম জেলা জজ মোকদ্দমার বিচারে প্রদান করে থাকে, শুধুমাত্র সেই ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে।

৩. ডিক্রিটির বিরুদ্ধে আপীল করা আইনে নিষেধ আছে কিনা? যদি আইনে নিষেধ থাকে তাহলে সেটা ডিক্রি হলেও তার বিরুদ্ধে আপীল দায়ের করা যাবেনা।

দেওয়ানী কার্যবিধির ২(২) ধারা অনুযায়ী, আরজি নাকচ একটি ডিক্রি। যেহেতু ২(২) ধারায় আরজি নাকচকে একটি ডিক্রি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাই এর বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে। আবার ৯৬ (২) ধারায় বলা হয়েছে একতরফা ডিক্রি হতে আপীল দায়ের করা যায়।

কোন কোন ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যায় না?

ডিক্রি হলেও নিম্নলিখিত ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যায় না কারণ এই সকল ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা আইনে নিষেধ। যথা:

১. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারায় আদালত কর্তৃক প্রদত্ত কোন সিদ্ধান্ত ডিক্রি হলেও তার বিরুদ্ধে আপীল দায়ের করা যাবেনা। কারণ এই আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে, এই ধারার অধীন প্রদত্ত কোন ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল বা রিভিউ দায়ের করা যাবেনা।

২. দেওয়ানী কার্যবিধির ৯৬ (৩) ধারায় বলা হয়েছে, আদালত পক্ষদ্বয়ের সম্মতিতে আপস বা সোলে ডিক্রি [Compromise Decree] দিলে তার বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে না। আদেশ ২৩ এর বিধি ৩ অনুযায়ী আদালত আপস ডিক্রি বা সম্মতিসূচক ডিক্রি দিয়ে থাকে এবং এমন ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে না।

৩. ক্ষুদ্র এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের প্রদত্ত কোন ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যাবেনা [২৫ ধারা, ক্ষুদ্র এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত আইন; ১৮৮৭]।

৪. আপীল শুনানী শেষে আপীল আদালত কোন ডিক্রি দিলে, উক্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যাবেনা।

উপরের উল্লেখিত ক্ষেত্রে যেহেতু আপীল করা যায় না, তাই এই সকল ডিক্রির বিরুদ্ধে রিভিশন করা যাবে। অন্যদিকে ৮৯ক ধারা অনুযায়ী মধ্যস্থতার মাধ্যমে আদালত কোন আদেশ বা ডিক্রির দিলে তার বিরুদ্ধে কোনরূপ আপীল বা রিভিশন করা যাবেনা।

উদাহরণ ১: A, B -এর বিরুদ্ধে সহকারী জজ আদালতে একটি চুক্তি রদের মোকদ্দমা দায়ের করে। চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে অনুচিত প্রভাব থাকায় আদালত চুক্তিটি বাদী কর্তৃক বাতিলযোগ্য হিসাবে গণ্য করে এবং চুক্তিটি রদের ডিক্রি প্রদান করে। যেহেতু বিচারিক আদালত বা আদি এখতিয়ার প্রয়োগকারী, সহকারী জজ, কর্তৃক চুক্তি রদের ডিক্রি প্রদান করা হয়েছে, সেহেতু উক্ত ডিক্রিটি একটি আপীলযোগ্য ডিক্রি এবং এর বিরুদ্ধে জেলা জজের নিকট আপীল করা যায়। যদি জেলা জজ আপীল শুনানী শেষে চুক্তি রদের ডিক্রি বহাল রাখে। জেলা জজের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীল করা যাবেনা। কারণ জেলা জজ সিদ্ধান্ত দিয়েছে আপীল শুনানী শেষে এবং দেওয়ানী মোকদ্দমায় দ্বিতীয় আপীল চলেনা। তাই এই ক্ষেত্রে রিভিশন করা যাবে।

উদাহরণ ২: A, B-কে আইনগত পন্থা ব্যতীত বলপূর্বক দখলচ্যুত করে। B দখল উদ্ধারের জন্য A এর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারায় সহকারী জজের নিকট মোকদ্দমা দায়ের করে। সহকারী জজ সম্পত্তির দখল B এর নিকট অর্পণের জন্য ডিক্রি প্রদান করে। ডিক্রিটি প্রদান করেছে আদি এখতিয়ার প্রয়োগকারী বা বিচারিক আদালত তথা সহকারী জজ। সেহেতু এটা একটি আপীলযোগ্য ডিক্রি। কিন্তু যেহেতু সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে, এই ধারার অধীন প্রদত্ত কোন ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল বা রিভিউ চলবে না, সেহেতু বিচারিক আদালত ডিক্রিটি দিলেও, এই ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যাবেনা।

কিভাবে দেওয়ানি আদালতে আপীল দায়ের করতে হয়?

৪১ আদেশে আপীল সংক্রান্ত পদ্ধতিগত বিধান আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কিভাবে আপীল দায়ের করতে হবে, আপীলের শুনানী কখন হবে, শুনানী মুলতুবি, আপীল শুনানীর সময় হাজির না হলে তার ফলাফল ইত্যাদি সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।

আপীলের আকার [Form of Appeal] কি?

৪১ আদেশের বিধি ১ অনুযায়ী প্রত্যেকটি আপীল আপীলের স্বারকলিপি [Memorandum of Appeal] আকারে দায়ের করতে হবে।

১. আপীলের স্বারকলিপি আপীলকারী কর্তৃক বা তার উকিল কর্তৃক স্বাক্ষরিত হতে হবে। এটা বাধ্যতামূলক;

২. আপীলের স্বারকলিপিতে যে ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা হয়ে সেই ডিক্রির আপত্তিসমূহ উল্লেখ করতে হবে:

৩. আপীলের স্বারকলিপির সাথে একটি ওকালতনামা দিতে হবে যদি আইনজীবী আপীল দায়ের করে:

৪. যে ডিক্রি ও রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করা হচ্ছে সেই ডিক্রি ও রায়ের একটি সত্যায়িত কপি সাথে দিতে হবে।

আপিলে কোন কোন কারণসমূহ গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

৪১ আদেশের বিধি ২ অনুযায়ী আপিলের স্মারকলিপিতে বা মেমোতে উল্লেখ করা হয়নি এরূপ কোন কারণ বা হেতু সম্পর্কে আপিলকারী তার বক্তব্য আদালতের অনুমতি ব্যতীত পেশ করবেনা। অর্থাৎ একমাত্র আপিল আদালতের অনুমতি নিয়ে আপিলকারী এমন হেতুসমূহ শুনানিকালে উত্থাপন করতে পারে।

কখন আদালত আপিলের স্মারকলিপি প্রত্যাখ্যান করতে পারে?

আপিলের স্মারকলিপি নির্ধারিত পদ্ধতিতে না লিখলে ৪১ আদেশের ৩ বিধির অধীনে আপিল আদালত আপিলের স্মারকলিপি-

১. প্রত্যাখ্যানের আদেশ দিতে পারে বা

২. আদালত কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে সংশোধনের জন্য ফেরতের আদেশ দিতে পারে।

কখন আদালত ডিক্রি কার্যকরণ স্থগিত করতে পারে?

আদেশ ৪১, বিধি ৫ অনুযায়ী বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল দায়ের করা হয়েছে শুধুমাত্র এই কারণে উক্ত ডিক্রির অধীন কোন কার্যক্রম আপনা আপনি স্থগিত হবেনা বা উক্ত ডিক্রি কার্যকর করা আপনা আপনি স্থগিত হবেনা। যে ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা হয়েছে উক্ত ডিক্রি স্থগিতের জন্য আপীলকারীকে আবেদন করতে হবে এবং এই আবেদনটি করতে হবে ডিক্রি প্রচারকারী বিচারিক আদালতে। আদেশ ৪১, বিধি ৫(১) অনুযায়ী আপিল আদালতের ক্ষেত্রে কোন ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল দায়ের করা হয়েছে শুধুমাত্র এই কারণে কোন ডিক্রি কার্যকর করা আপনা আপনি স্থগিত হবে না। কিন্তু ৪১ আদেশের ৫ (১) বিধির অধীন আপীল আদালত যথেষ্ট কারণে ডিক্রি কার্যকর করা স্থগিতের আদেশ দিতে পারে।

কখন ডিক্রি প্রচারকারী আদালত কর্তৃক ডিক্রি কার্যকর স্থগিতের আদেশ দিতে পারে?

৪১ আদেশের ৫(২) বিধির অধীন আপীলের জন্য নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কোন আপীলযোগ্য ডিক্রি স্থগিতের জন্য উক্ত ডিক্রি প্রচারকারী আদালতে আবেদন করা যায়। এই ক্ষেত্রে ডিক্রি প্রচারকারী আদালত যথেষ্ট কারণে উক্ত ডিক্রি কার্যকর করা স্থগিতের আদেশ দিতে পারে।

টপিকস 

আপীল কি? কে আপীল দায়ের করতে পারে? আপীল দায়ের এবং দায়েরের সময় কতদিন? কোন কোন ক্ষেত্রে আপীল করা যায়? মূল বা আদি ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল সংক্রান্ত বিধান কি কি? কোন কোন ডিক্রির বিরুদ্ধে আপীল করা যায় না? কিভাবে দেওয়ানি আদালতে আপীল দায়ের করতে হয়? আপিলে কোন কোন কারণসমূহ গ্রহণযোগ্য হতে পারে? আপীলের আকার [Form of Appeal] কি? কখন আদালত আপিলের স্মারকলিপি প্রত্যাখ্যান করতে পারে? কখন আদালত ডিক্রি কার্যকরণ স্থগিত করতে পারে? 

ইউটিউব ভিডিও - দেওয়ানী মামলার আপীল Appeal কি? আপিল দায়েরের পদ্ধতি কি

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)
3/related/default